মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১১:১৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিস্ফোরণ-ধস-আগুন, বহু হতাহতের আশঙ্কা জনগনের ওপরে যারা ক্ষমতা প্রদর্শন করবে তারা দলের শত্রু : তথ্যমন্ত্রী ফিলিস্তিনের সেই কিশোরীকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর আবেগঘন বার্তা বরিশাল রেড ক্রিসেন্টে চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ বরিশালে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেত্রীর গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ত্রিমুখী সংঘর্ষে রিকসা চালক নিহত, আহত-১০ আন্দোলনে সমর্থন দেয়ার পরদিনই ছাত্রদের ঘরে ফেরার বার্তা সালমান খানের পদত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মৌলভীবাজারে জলপ্রপাতে আটকা পড়া ১০ পর্যটক উদ্ধার গৌরনদীর মহিলা মাদ্রাসার আবাসিক রুম থেকে ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার

মুল্লুকে চল আজ সেই রক্তমাখা দিন শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ মে, ২০২৫
  • ১৪৫ বার

২০ মে ১৯২১ সাল। ইতিহাসের পাতায় একটি রক্তাত্বময় দিন। পুরো একটা শতাব্দী ধরে এই দিনটি বয়ে বেড়াচ্ছেন নিজ দেশে যাওয়ার আন্দোলনে যোগ দেওয়া মানুষগুলো ও তাদের স্বজনরা।

সেই থেকেই রক্তাক্ত ওই দিনটিকে পালন করা হচ্ছে চা-শ্রমিক দিবস হিসেবে।

তবে এখন তারা আর মুল্লুকে যেথে চান না। পেতে চান সেই দিনের ‘মুল্লুকে চল’ দিবসটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কিন্তু, সাধারণ শ্রমিকদের অব্যাহত দাবির মুখে শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও মেলেনি আজও দিবসটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

জানা যায়, নিশ্চিত উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জন্মভিটা ছেড়ে এসেছিলেন একদল মানুষ। ভারতের খরা ও দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলের এসব মানুষকে স্বপ্নের ফাঁদে ফেলা হয়েছিল।

সিলেট অঞ্চল ও আসামের গভীর জঙ্গলে চা-বাগান তৈরি করতে আসা এসব মানুষের অর্থ ও স্বাচ্ছন্দ্যের মোহ কাটতে বেশি দিন লাগেনি।

অল্পদিনেই বুঝে গিয়েছিলেন তাঁরা ঠকেছেন, হয়েছেন প্রতারিত। তাঁদের মিথ্যা স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। স্বপ্নচ্যুত এই মানুষেরা তাঁদের জন্মভিটায় ফিরে যেতে ‘মুল্লুকে চলো’র ডাক দিয়ে একদিন পথে নেমেছিলেন।

ফেরার পথে ১৯২১ সালের ২০ মে চাঁদপুরে গোর্খা সৈন্যরা সেই ঘরমুখী মানুষের ওপর হামলা করেন। এতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

ফলে অনেকেরই আর ঘরে ফেরা হয়নি। এ অঞ্চলের চা-চাষের বৃত্তবন্দী জীবনে তাঁরা স্থায়ী শ্রমিক হয়ে বাঁধা পড়েন। সেই রক্তাক্ত দিনটি এখন চা-শ্রমিকদের কাছে স্বপ্নভঙ্গের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে আছে। চা-শ্রমিকেরা ২০ মে ‘চা-শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকেন।

১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় চা-বাগান তৈরির মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চা-বাগানের যাত্রা শুরু হয়। ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের টিলাভূমিতে একের পর এক চা-বাগান তৈরি করতে থাকে। তখন অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ে।

কিন্তু এ অঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি জমিতে সাপ, জোঁক ও পোকামাকড়ের মধ্যে কাজ করার মতো শ্রমিকের অভাব ছিল। ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো তখনকার অবিভক্ত ভারতের উড়িষ্যা (ওডিশা), বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, মাদ্রাজ, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত, অনুর্বর অঞ্চলে দালাল নিয়োগ করে।

 

গরিব মানুষকে সুন্দর ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখায় দালাল চক্র। চা-বাগান তৈরির জন্য নিয়ে তাঁদের আনা হয় আসাম ও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের গভীর জঙ্গলে। কোম্পানির মালিকেরা এই লোকগুলোকে চা-বাগান প্রস্তুত করার অমানুষিক কাজে বাধ্য করেন।

চা-শ্রমিকদের নিয়মিত এক বেলা পেটপুরে খেতেও দেওয়া হতো না। অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে অনেক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন।

এ ছাড়া কথায় কথায় চা-শ্রমিকদের ওপর চালানো হতো শারীরিক নির্যাতন ও নিপীড়ন। দ্রুতই চা-শ্রমিকদের সুন্দর জীবনের মোহ কেটে যায়। অসহনীয় হয়ে ওঠে নিপীড়ন-নির্যাতন।

চা-শ্রমিকেরা গোপনে ‘নিজ মুল্লুকে (নিজ দেশে)’ চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু ফিরে যাওয়ার পথ কারও জানা নেই। তাঁদের শুধু জানা ছিল, চাঁদপুর থেকে স্টিমারে কলকাতা যাওয়া যায়।

এই জানাটুকু সম্বল করেই ১৯২১ সালে দিনক্ষণ ঠিক করে কাছাড় ও সিলেটের প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক ‘মুল্লুকে চলো’র ডাক দিয়ে পথে নামেন। দিনের পর দিন দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে একসময় নদীবন্দর চাঁদপুরে গিয়ে পৌঁছান তাঁরা।

পথে পথে খাদ্যের অভাব, অসুখে অনেক শিশু ও নারীর মৃত্যু ঘটে। চা-শ্রমিকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন চা-শ্রমিক নেতা গঙ্গাদয়াল দীক্ষিত, দেওশরন ত্রিপাঠি, হরি চরণ প্রমুখ।

এদিকে চা-বাগান ছেড়ে আসা চা-শ্রমিকদের পথ রোধ করতে সরকারের সহযোগিতায় চাঁদপুরে মোতায়েন করা হয় আসাম রাইফেলের গোর্খা সৈন্য।

স্টিমারে উঠতে চাইলে গোর্খা সৈন্যের প্রতিরোধের মুখে পড়েন চা-শ্রমিকেরা।

শ্রমিকদের বিদ্রোহ ঠেকাতে ১৯২১ সালের ২০ মে সৈন্যরা নির্বিচার গুলি করেন।

এতে স্টিমার ঘাট ও রেলস্টেশনে অপেক্ষমাণ বিপুল শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেন।

হত্যাযজ্ঞের কারণে এই আন্দোলন তখন একটি সর্বভারতীয় শ্রমিক আন্দোলনে রূপ নেয়। তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে চাঁদপুর ও লাকসাম জংশনের রেল শ্রমিকেরা ২১ মে থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেন।

২৪ মে থেকে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের শ্রমিক এবং ২৮ মে থেকে স্টিমার ধর্মঘট চলতে থাকে।

আসাম বেঙ্গল রেলশ্রমিকেরা তিন মাস এবং স্টিমার শ্রমিকেরা ছয় সপ্তাহ ধর্মঘট পালন করেন।

এই ধর্মঘট ও দেশজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ফলে ব্রিটিশ চা-বাগানের মালিকেরা শ্রমিকদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এ সময় চা-বাগানের মালিক ও প্রশাসনের প্রতিশ্রুতিতে কিছু শ্রমিক বাগানে ফিরে আসেন। অনেকে ফিরে যান ‘নিজ মুল্লুকে’।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজড়া বলেন, চা শ্রমিকরা সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এ দেশে বাস করছে।

তারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযোদ্ধে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল।

সেই চা শ্রমিকরা আজও অবহেলিত। বর্তমান অন্তবর্তীকালিন সরকারের কাছে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দাবি জানাচ্ছি- এই অবহেলিত চা শ্রমিকদের বাসস্থানের জায়গাটুকু যাতে তাদের নিজের নামে করে দেয়া হয়। যাতে বাগান কর্তৃপক্ষ তাদের যখন তখন ভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে না পারে।

আজ ২০ মে ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের ১০৪তম বার্ষিকী। বাংলাদেশে চা শ্রমিকদের রক্তস্নাত এই দিনকে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে চা শ্রমিকরা পালন করে আসছে।

ঐতিহাসিক চা শ্রমিক দিবসে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশনের উদ্যোগে সকাল ৯টায় মৌলভী চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অস্থায়ী শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান, চা শ্রমিক সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সভাপতিত্ব করেন মৌলভী চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি জ্ঞান উড়াং এবং সঞ্চালনা করেন চা শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কিরণ শুক্ল বৈদ্য।

বক্তব্য রাখেন চা শ্রমিক ফেডারেশনের উপদেষ্টা শ্রমিক নেতা অ্যাডভোকেট আবুল হাসান, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ, চা শ্রমিক দ্বীপচান, রনি প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

সমাবেশে চা শ্রমিকদের দৈনিক নগদ মজুরি ৬০০ টাকা নির্ধারণ, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য অধিকারসহ মর্যাদাপূর্ণ জীবন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৭দফা দাবি আদায়ের

নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2021 anondobarta24.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com